কুরবানি দেয়ার নিয়মাবলি - কুরবানি দেয়ার শর্তাবলি
কুরবানি দেয়ার কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। কুরবানি দেয়ার নিয়মাবলি ও কুরবানি দেয়ার শর্তাবলি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।আমরা অনেকেই কুরবানি দেয়ার নিয়মাবলি সম্পর্কে অবগত নই।শুধু বাজার থেকে পশু কিনে এনে পশু জবেহ করলেই কুরবানি হয় না কখনও হবেও না।তাই কুরবানি দেয়ার নিয়মাবলি ও কুরবানি দেয়ার শর্তাবলি গুলো জেনে রাখা জরুরী।
ঈদুল আজাহা।এই দিন মহান আল্লাহ্ পাক রব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টির জন্য তার নৈকট্য
হাসিল করার জন্য কুরআনুল কারিমে কুরবানি করার নির্দেশ করা হয়েছে এভাবে ''অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন'' ( সূরা কাউসার; আয়াত-২ )
পেইজ সূচিপত্র ঃ- কুরবানি দেয়ার নিয়মাবলি - কুরবানি দেয়ার শর্তাবলি
কুরবানি দেয়ার নিয়মাবলি গুলো
কুরবানি দেয়া হয় শুধু মাত্র মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীনকে সন্তুষ্টি করার
জন্য। কোরবানি করা মহান আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালার কাছে অনেক পছন্দের
একটি ইবাদত। প্রতিবছর মুসলমানরা ঈদুল আযহার দিনে মহান আল্লাহকে রাজি খুশি করার
উদ্দেশ্যে ও মহান আল্লাহ পাকের সান্নিধ্য হাসিল করার জন্য পশু কুরবানী
করে থাকে।
পবিত্র কুরআনুল কারীমের মধ্যে এসেছে এইভাবে ''হে রাসুল! আপনি বলুন,
অবশ্যই আমার নামাজ , আমার কোরবানি , আমার জীবন, আমার মৃত্যু বিশ্ব জগতের
প্রতিপালক মহান আল্লাহ তাআলার জন্যই '' (সূরা আনআমঃ আয়াত ১৬২)
এই কোরবানি দেয়ার কিছু নিয়ম কানুন রয়েছে। বর্তমান যুগে সবাই মনে করে যে টাকা
দিয়ে বাজার থেকে পশু কিনে এনে বিসমিল্লাহ বলে জবাই করলেই কোরবানি হয়ে
যায়। কিন্তু বিষয়টা মোটেও এমন নয়। কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।কুরবানি
দেয়ার নিয়মাবলি গুলো সম্পর্কে নিচে উল্লেখ করা হলো ঃ
কুরবানী করার জন্য যেই পশুটি নিশ্চিত করা হবে সেই পশু ঈদের দিন কোরবানি করা
ছাড়া আর অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না। নির্দিষ্ট পশুটি বিক্রয় করা যাবেনা
এবং দান করা যাবে না। তবে সহিহ্ ভাবে কুরবানী আদায় করার উদ্দেশ্যে
নির্দিষ্ট পশু টিকে তার চেয়ে উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা যাবে।
কোন ব্যক্তি যদি কুরবানী করার উদ্দেশ্যে পশু ক্রয় করে থাকে অথবা পূর্বেই তার
কাছে পশু রয়েছে কোরবানির জন্য। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি মারা যায় তাহলে
ওয়ারিশদের দায়িত্ব হবে সেই রেখে যাওয়া পশুকে দিয়ে কোরবানি
বাস্তবায়ন করা।
কোরবানির জন্য নিশ্চিত করা পশু থেকে কোনভাবে উপকৃত হওয়া যাবে না এবং তার
কোন কিছু ভোগ করা যাবে না। অর্থাৎ কুরবানীর পশুর দুগ্ধ পান করা যাবে না অথবা
বিক্রয় করা যাবে না। কৃষি কাজ সহ কোন প্রকার কাজে সেই পশুকে ব্যবহার করা যাবে
না। কুরবানীর পশুকে সওয়ারির কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোরবানির পশুর গা
থেকে যদি পশম আলাদা করা হয় তাহলে সেটি সদকা করে দিতে হবে অথবা নিজে ব্যবহার
করতে হবে বিক্রয় করা যাবে না।
নিজস্ব অবহেলা বা অযত্নের কারণে যদি কোরবানির পশুটি ত্রুটিযুক্ত হয়ে
পড়ে, অথবা হারিয়ে যায় অথবা চুরি হয়ে যায় , তাহলে কুরবানী দেওয়ার
কর্তব্য হচ্ছে অনুরূপ অথবা তার থেকে ভালো একটি পশু পুনরায় ক্রয় করা। হ্যাঁ
তবে অনিচ্ছাকৃত ভাবে কোরবানির পশু দোষ যুক্ত হয়ে গেলে পশুটি কোরবানি
করা যাবে।
যদি কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা পশুটি হারিয়ে যায় অথবা চুরি হয়ে
যায়, এবং কুরবানী দাতার ওপর পূর্বেই কোরবানি ওয়াজিব হয়ে গেছে এমতাবস্থায়
সে ব্যাক্তি কোরবানির দায়িত্ব হতে অব্যাহতি অর্থাৎ রেহাই লাভ করবে।
যদি এমন কোন ব্যক্তি যার পূর্ব থেকে কোরবানি ওয়াজিব ছিল না কিন্তু সে
ব্যক্তি কোরবানি করার উদ্দেশ্যে পশুপ ক্রয় করেছিল এবং তা চুরি হয়ে গেছে
অথবা মারা গিয়েছে অথবা হারিয়ে গিয়েছে । এমত অবস্থায় সেই ব্যক্তিকে পুনরায়
পশু ক্রয় করে কোরবানির সম্পন্ন করতে হবে
বিশুদ্ধভাবে কুরবানি হওয়ার শর্তাবলি
বিশুদ্ধভাবে কুরবানী হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্তাবলী রয়েছে। তথাকথিত সমাজে আমরা
কোরবানির সম্পর্কে খুব একটা অবগত নয়। আমাদের কোরবানি সহিহ্ ভাবে
হচ্ছে কিনা কুরবানী বিশুদ্ধভাবে দিতে পারছি কিনা সেই বিষয়ে আমরা ভ্রুক্ষেপ করি
না। কিন্তু আমাদের সকলের উচিত কোরবানি বিষয়ে সকল প্রকার জ্ঞান অর্জন করা।
আমরা প্রতিবছর মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করে থাকি।
কিন্তু আমাদের কোরবানি যদি কবুল না হয় তাহলে প্রতিবছর শুধু শুধু জবাই করা
হবে আর মাংস খাওয়া হবে। মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জন করা হবে না,
তার সানিধ্য হাসিল করা যাবে না। আর এমনটা হবে শুধুমাত্র আমাদের অজ্ঞতার কারণে।
এই জন্যই মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলমানের
জন্য ফরজ করে দিয়েছেন। বিশুদ্ধভাবে কোরবানির হওয়ার শর্তাবলী গুলো নিচে উল্লেখ
করা হলোঃ
বিশুদ্ধভাবে কোরবানি হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে -কুরবানী করতে
হবে পরিপূর্ণ ইখলাস অর্থাৎ একনিষ্ঠতার সঙ্গে। কোরবানি করতে হবে শুধুমাত্র
আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। কুরবানীর নিয়ত হতে
হবে পরিশুদ্ধ। নচেৎ কুরবানী কবুল হবে না। পৃথিবীতে
সর্বপ্রথম কোরবানি অনুষ্ঠিত হয়েছিল হাবিল এবং কাবিল এর মধ্যে। এক্ষেত্রে
হাবিলের কুরবানী কবুল হয়েছিল। আর কাবিলের কোরবানি কবুল না
হওয়ায় হাবিলের বাণী হচ্ছে '' নিশ্চয় মহান আল্লাহ পাক রব্বুল
আলামীন মুত্তাকী পরহেজগার ও সংযমিদের কোরবানি কবুল করে থাকেন''
( সূরা মায়িদাঃ আয়াত ২৭ )
কুরবানী করার জন্য একনিষ্ঠতা অর্জন করা কতটা জরুরি তা মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল
আলামিন কুরআনুল কারীমের মধ্যে স্পষ্ট বর্ণনা করে দিয়েছেন এভাবে '' আল্লাহর
কাছে কুরবানীর রক্ত-মাংস কোন কিছুই পৌঁছায় না। বরং শুধু মাত্র আমাদের
তাকওয়া মহান রবের কাছে পৌঁছায়''
এভাবে তিনি এগুলিকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছে যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব
ঘোষণা কর এই জন্য যে তিনি তোমাদেরকে পথপ্রদর্শন করেছে। আর তুমি সুসংবাদ দাও
সৎকর্মশীলদেরকে ( সুরা হজ্ব ঃ আয়াত ৩৭ )
কোরবানির বিশুদ্ধভাবে হওয়ার দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে -কুরআন
সুন্নাহ মোতাবেক কুরবানী সম্পন্ন করা। মহান আল্লাহতালা ও তাঁর রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর নির্দেশিত বিধান অনুযায়ী কোরবানি সম্পন্ন করতে
হবে। কুরবানী হবে শুধুমাত্র মহান আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য। শুধুমাত্র তার
নৈকট্য অর্জন করার লক্ষ্যে।
মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি ব্যতীত আর কোন উদ্দেশ্য কোরবানি করা যাবে না।
কোরআনুল কারীমের মধ্যে মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন বলেন এভাবে '' যে
তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করলো সে যেন সৎ কর্ম করে এবং তার রবের
ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করে'' (সূরা কাহফঃ আয়াত ১১০ )
দশে জিলহজ ফজর থেকে শুরু করে ১২ই জিলহজ সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত যদি কোন
প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ জ্ঞ্যান সম্পন্ন নারী অথবা পুরুষের কাছে প্রয়োজনের
চেয়ে বেশি অর্থাৎ সাত ভরি স্বর্ণ কিংবা সারে বায়ান্ন তোলা রুপা অথবা
এই সমপরিমাণ সম্পদ থাকে তাহলে তারপর কুরবানী ওয়াজিব হবে।
অর্থ সম্পদ , স্বর্ণ-রোপ্য, ব্যবসার পণ্য, প্রয়োজনের থেকে বেশি
জমি কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসেবযোগ্য।
কুরবানির পশু সম্পর্কে ধারণা
কুরবানী করার জন্য এমন প্রশ্ন নিশ্চিত করতে হবে যেটা ইসলামিক শরিয়া অনুযায়ী
নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে হচ্ছে উট, গরু , মহিষ, ছাগল , দুম্বা ও
ভেড়া। কুরআনুল মাজিদের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ( মাহিমাতুল আনআম )
হাদীস শরীফের মধ্যে এসেছে ''তোমরা অবশ্যই নির্দিষ্ট বয়সের পশু কোরবানি করবে,
এটি তোমাদের জন্য দুষ্কর হলে ৬ মাস বয়সের মেষ শাবক কুরবানী করা যাবে''
পরিপূর্ণ বয়সের জন্তু কোরবানি করতে হবে। ইসলামিক শরীয়তের উপর ভিত্তি করে
কোরবানির যন্তর বয়সের দিকে খেয়াল রাখা উচিত। ইসলামিক শরীয়ত
অনুযায়ী উটের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর হতে হবে। গরু অথবা মহিষের ক্ষেত্রে দুই বছর
হতে হবে। ছাগল-ভেড়া অথবা দুম্বার ক্ষেত্রে এক বছর হতে হবে।এখানে আমাদের সমাজে
প্রচলিত এক দাত দুই দাত নিয়ে মতবিরোধ করা ভিত্তিহীন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির জন্য উপরের উল্লেখিত
জন্তু গুলোকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এগুলো ছাড়া তিনি যেমন অন্য কোন পশু
দ্বারা কুরবানী করেননি তদ্রুপ কুরবানী করতেও বলেননি।
উট, গরু এবং মহিষ এই পশু গুলোর ক্ষেত্রে ৭ জন শরিক হয়ে কোরবানি দেওয়া
যাবে। হাদীস শরীফের মধ্যে এসেছে '' আমরা হুদাইবিয়াতে রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম, অতঃপর আমরা উট এবং গরু
দ্বারা সাত জন শরিক হয়ে কোরবানি করেছিলাম।
বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা এসেছে ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলাইহির মতে,
তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম শিংওয়ালা সাদা
কালো এ ধরনের দুম্বা কুরবানী করেছেন।
কুরবানী করার ক্ষেত্রে কুরবানির জন্তু নিখুঁত এবং পরিপুষ্ট হওয়া উচিত।
কারণ আমরা কাউকে কোন উপহার দিলে সর্বোত্তম বস্তুটি দেওয়ার চেষ্টা করি
যেন উপহার গ্রহণকারী তা পেয়ে খুশি হয়। ঠিক তেমনি ভাবেই
আমরা কুরবানী দেই আমাদের রবের জন্য। রব কে রাজি খুশি করার জন্য। যদিও
এগুলোর কোন কিছুই রবের কাছে পৌঁছায় না। এর মাধ্যমে রব আমাদের তাকওয়ার
পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। তাই পরীক্ষার মাধ্যমটা উত্তম হওয়া উচিত।
কুরবানির পশুর উপর মালিকানা
কুরবানি করার জন্য নিশ্চিত করা পশুটির উপর যে ব্যাক্তি কুরবানি করবে তার
পরিপূর্ণ মালিকানা থাকতে হবে।যদি পশুটি তার কাছে বন্ধক রাখা হয় অথবা ধার করে
নিয়ে আসা পশু হয় অথবা পরে পাওয়া পশু হয় তাহলে সে পশু দ্বারা কুরবানি করা যাবে
না।কুরবানি করার জন্য পরিপূর্ণ মালিকানা থাকতে হবে।
পোষ্ট পড়ে আমাদেরকে আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন। আপনাদের প্রতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়
comment url