কুরবানি ঈদের আমল - ঈদুল আজাহার বিশেষ আমল

ঈদুল আজাহা অর্থাৎ কুরবানি ঈদ। অনেকেরই কুরবানি ঈদের আমল সম্পর্কে প্রশ্ন থেকেই যায়।যেহুতু এই সময়টাতে জিলহজ মাসের আমল নিয়ে মানুষ বেশি ব্যাস্ত থাকে তাই কুরবানি ঈদের আমল সম্পর্কে তেমন মনযোগ থাকে না। কিন্তু কুরবানি ঈদের আমল এর বিষয়বস্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কুরবানি ঈদের আমল - ঈদুল আজাহার বিশেষ আমল
যেহুতু জিলহজ মাসের দশম দিনে ঈদুল আজাহা উদযাপিত হয়।ইসলামের দুটি বড় ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে অন্যতম একটি।কুরবানি ঈদের অনেক ফজিলত রয়েছে।কুরবানি ঈদ সম্পর্কে অবশ্যই জানতে হবে।কুরবানি ঈদের আমল এবং ঈদুল আজাহার বিশেষ আমল গুলো সম্পর্কে সকল মুসলিমের অবগত হওয়া জরুরি।

পেইজ সূচিপত্রঃ- কুরবানি ঈদের আমল - ঈদুল আজাহার বিশেষ আমল

কুরবানি ঈদের আমল সম্পর্কে কিছু কথা

ঈদুল আযহা অর্থাৎ কোরবানি ঈদ। কুরবানি ঈদ হচ্ছে আত্মত্যাগের ও মহান আল্লাহ সুবাহানাহুওয়া তা'আলার সান্নিধ্য ও নৈকট্য হাসিল করার ইবাদতের দিন। প্রতিবছর মুসলিম উম্মাহ এর কাছে আত্মত্যাগ ও পরীক্ষার বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয় এই উৎসব। ঈদুল আযহা অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ একটি উৎসবের দিন।

মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন এই দিনে তার মোখলেস বান্দাদের পরিক্ষা নিয়ে থাকেন ঠিক যেভাবে পরিক্ষা নিয়েছিলেন তার খলিল (বন্ধু) হজ্রত ইব্রাহিম (আ) এর।মহান আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'আলার কাছে এই ্দিনটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের জন্য অনেক ফজিলতপূর্ণ দিন। মহান আল্লাহ বলেন যদি কোন বান্দা খালেস দিলে আমার জন্য পশু কোরবানি করলো সেই কুরবানি রক্তের প্রথম ফোটা মাটিতে পরার আগে আল্লাহ্‌ কুরবানি কবুল করে নিবেন।


আর কুরবানি কবুল হওয়ার অর্থ এই কুরবানির পশুর গায়ে যতগুলো লোমকূপ রয়েছে সবগুলোর বিনিময়ে একটি করে নেকি সেই ব্যাক্তির আমলনামায় যোগ করা হবে।এই মহা ফজিলতপূর্ণ দিনটিতে বিশেষ কিছু আমল রয়েছে। এই দিনে কি কি আমল করতে হয় সে সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য পুরো লেখনী পড়তে হবে।

ঈদুল আজাহা শব্দের অর্থ কি

ঈদুল আজাহা শব্দের অর্থ আরবিতে ঈদ শব্দের অর্থ হছে 'উৎসব' অথবা 'উদ্‌যাপন'।আর আজাহা শব্দের অর্থ হচ্ছে 'বলিদান' করা বা 'ত্যাগ' করা।

কুরবানি ঈদ শব্দের অর্থ হচ্ছে আরবি 'করব' বা 'কোরবান' শব্দ থেকে ফার্সি ও উর্দুতে কুরবানী শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ হচ্ছে নৈকট্য অথবা সান্নিধ্য। 'কুরবান' শব্দের অর্থে বোঝানো হচ্ছে প্রতিটি সেই বস্তু যার মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহ পাকের নৈকট্য হাসিল করা যায়। আর মূলত এখান থেকেই ফার্সি অথবা উর্দু কুরবানী শব্দটি বাংলায় সংগৃহীত হয়েছে। আর ঈদ শব্দের অর্থ হচ্ছে ' উৎসব',  'উদযাপন', 'ছুটির দিন', অথবা 'ভোজের দিন'।

ঈদুল আজাহা ও কুরবানি বিষয়ক কিছু হাদিস

ইসলামের বড় দুইটি উৎসব রয়েছে। একটি ঈদুল ফিতর ও অন্যটি ঈদুল আজহা। প্রতি বছর মুসলমানরা মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীনের নির্দেশে এই দুটি উৎসব পালন করে থাকে। ঈদ হচ্ছে মুসলমানদের খুশি আনন্দের দিন। এটি মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে প্রেরিত পবিত্র উৎসব। যেহেতু আমদের আজকের আলচ্য বিষয় হচ্ছে ঈদুল আজাহা নিয়ে। তাই এই ধাপে কুরবানি বিষয়ক কিছু হাদিস পেশ করা হলো- 

হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করে মদিনায় আসলেন তখন মদিনা বাসির দুটি উৎসবের দিবস ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জিজ্ঞাসা করলেন এ দুটি দিবস কি? ( কিভাবে তোমরা এই দুদিন উৎসব পালন করো? ) তখন তারা জবাব দিল জাহেলিয়াত অর্থাৎ ইসলাম পূর্ব যুগে আমরা এই দুইদিন উৎসব পালন করতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন আল্লাহ তোমাদেরকে এই দুইটি দিবসের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটি দিবস দান করিয়াছেন। আর এগুলো হচ্ছে ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। 

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা হতে বর্ণিত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আমাকে ইয়াওমুল আজহার আদেশ করা হয়েছে ( অর্থাৎ এই দিবসে কোরবানি করার আদেশ করা হয়েছে ) এই দিবসটিকে মহান আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'য়ালা এই উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছে। 

হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন কোন কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন না আর ঈদুল আযহার দিন নামাজ না পড়ে কিছু খেতেন না। 

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন এবং পায়ে হেঁটে ঈদগাহ থেকে ফিরতেন। 

জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা বলেন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম ঈদের দিনে এক পথ দিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং ভিন্ন পথ দিয়ে বাড়ি ফিরতেন।
জুবায়ের ইবনে নুফাইর রাহ  বলেন সাহাবা একরাম ঈদের দিন পরস্পরের সাথে সাক্ষাৎ হলে বলতেন আল্লাহ কবুল করুন আমাদের পক্ষ হতে ও আপনার পক্ষ হতে। 

তায়েবি ইয়াযিদ ইবনে খুমাইর রাহ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে বুস্র রাহ  তিনি ঈদুল ফিতর অথবা ঈদ উল আযাহার দিন লোকদের সাথে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য ঈদগাহে গেলেন। অতঃপর ইমামের আসতে দেরি হলে তিনি এর প্রতিবাদ জানালেন এবং বললেন এ সময় তো আমরা রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সাথে নামাজ পড়ে ফারেগ হয়ে যেতাম। আর এটা নফলের অর্থাৎ চাস্তের সময় ছিলো।

হযরত আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাঃ তার স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু দ্বারা কুরবানী করেছেন।  গরু দ্বারা কোরবানির বিষয়টি হযরত জাবের রাঃ এর সূত্র বর্ণিত হয়েছে।

হযরত বারা ইবনে আযিব রাঃ কুরবানীর পশু সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর হাত দিয়ে ইশারা করেছেন আমার হাত তার হাত থেকে ছোট এবং বলেছেন চার ধরনের পশু দ্বারা কুরবানী করা যায় না। যে পশুর এক চোখের দৃষ্টিহীনতা স্পষ্ট, যে পশু অতি রুগ্ন, যে পশুর সম্পূর্ণ খোরা এবং যে পশু এত শীর্ণ যে তার হাড়ে মজ্জা নেই।লোকেরা বলল কিন্তু আমরা তো দাত, কান ও লেজে ত্রুটিযুক্ত প্রাণী দ্বারা কুরবানি করা অপছন্দ মনে করি।অতঃপর নবিজী বলেন তোমাদের ইচ্ছা অন্যের উপর হারাম করো না।

হজরত জাবির (রা) বলেন আমরা হজ্বের ইহরাম বেধে রাসুল (সাঃ) এর সাথে বের হলাম।অতপর তিনি আমাদের আদেশ করলেন যেন আমরা প্রতিটি উট ও গরু সাতজন শরীক হয়ে কুরবানি করি।

অন্য বর্ননায় আছে হুজুরপাক (সাঃ) বলেন একটা গরু সাতজন পক্ষ হতে এবং একটা উট সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানি করা যায়।

নবীজি (সাঃ) বলেছেন সামর্থ থাকা সত্বেও যে ব্যাক্তি কুরবানি করল না সে যেন ইদ্গাহে না আসে। 

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন মহান আল্লাহ সবকিছুর উপর অনুগ্রহকে অপরিহার্য করেছেন। অর্থাৎ যখন তোমারা হত্যা করবে তখন উত্তম পদ্ধতিতে কর।

কুরবানি ঈদের আমল - ঈদুল আজাহার ইতিহাস

ঈদুল আজাহা অর্থাৎ কুরবানি ঈদ। প্রতি বছর এই দিন আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে এই দিনেই মহান আল্লাহ্‌র আদেশে হজরত ইব্রাহিম (আঃ) তার পরম ভালোবাসার পুত্র হজরত ইসমাঈল (আঃ) কে কুরবানি করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন।

মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন হজরত ইব্রাহিম (আঃ) কে সপ্নে তার সবথেকে প্রিয় বস্তু কুরবানি করার আদেশ দিলেন।   ( তুমি তোমার প্রিয় বস্তু আলাহ্‌র নামে কুরবানি করো ) 

সপ্নের আদেশ অনুজায়ি হজরত ইব্রাহিম (আঃ) ১০ টি উট কুরবানি করলেন।এবং পুনরায় তিনি একই সপ্ন দেখলেন এবং অতঃপর তিনি ১০০ উট কুরবানি করলেন।এবং তিনি তার পরেও একই সপ্ন দেখলেন।অতপর তিনি চিন্তা করলেন এই মুহুর্তে তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস তার সন্তান ইসমাঈল ছাড়া আর কিছু নাই।

অতপর তিনি তার পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানি করার সিদ্ধান্ত নিলেন।এবং কুরবানির উদ্দেশ্যে আরাফার ময়দানের দিকে রওনা হলেন।পথিমধ্যে শয়তান তাকে গোমরাহ্‌ করার জন্য ইব্রাহিম (আঃ) এবং তার পরিবার কে প্রলুব্ধ করেছিল।অতপর ইব্রাহিম (আঃ) পাথর ছুরে মেরেছিলেন।

আর এই ঘটনা থেকেই মুলত শয়তানকে প্রত্যাখান করার উদ্দেশ্যে হজ্জের সময় এই আমলটি করতে হয়।আরাফার ময়দানে শয়তানের অবস্থানের চিহ্নস্বরূপ নির্মিত তিনটি স্তম্ভে পাথর ছুরতে হয়।

যখন ইব্রাহিম আলাই সালাম তার পুত্রকে কুরবানী দেওয়ার জন্য গলায় ছুরি চালানোর চেষ্টা করলেন তখন তিনি দেখলেন তার পুত্রের পরিবর্তে সেখানে একটি প্রাণী কোরবানি হয়েছে এবং তার পুত্র পাশে দাঁড়ানো। তার পুত্রের কোনো ক্ষতি হয়নি। এখানে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহতালার আদেশ পালন করার জন্য কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে মহান আল্লাহ পাকের আদেশে অনেক অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে। এটি ছিল ৬ নম্বর পরীক্ষা। এবং এই পরীক্ষার মাধ্যমে মহান আল্লাহতালা সন্তুষ্ট হয়ে হযরতে ইব্রাহিম আঃ কে তার খলিল হিসেবে গ্রহণ করেন।

এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) মহান আল্লাহ পাকের আদেশ পালন করার জন্য কত বড় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কুরবানীর রক্ত মাংস কোন কিছুই মহান আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না।মহান আল্লাহ তায়ালা কাছে যেটা পৌছাই সেটা হচ্ছে আমাদের তাকওয়া।

অর্থাৎ তাকওয়ার সাথে কুরবানি করতে হবে।শুধু বাজার থেকে পশু কিনে এনে জবেহ্‌ করার নাম কুরবানি নহে।কুরবানি একটি কত বড় পরিক্ষা তা আমরা উপরের ইতিহাস থেকেই বুঝতে পারলাম।

কুরবানি ঈদের আমল - ঈদুল আজাহার বিশেষ আমল

ঈদুল আযহার দিনের প্রধান আমল হচ্ছে কুরবানী করা।মুসলমানদের জন্য কোরআন সুন্নাহর নির্দেশনা মোতাবেক কুরবানি করা আল্লাহ্‌র আদেশ।মহান আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বলেন ঃ অতএব তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কুরবানি কর ( সুরা কাউসারঃ আয়াত ২)

এতক্ষন  আমরা কুরবানি ঈদ সম্পর্কে বেশ অবগত হয়েছি।এখন এই ধাপে আমরা কুরবানি ঈদের দিনে করণীয় আমল গুলো সম্পর্কে অবগত হব।আমাদের আজকের এই লেখনী মূলত কুরবানি ঈদের আমল গুলো কি কি এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই।চলুন জেনে নিন ঈদের দিন কি আমল গুলো করতে হয়।

ঈদের দিনে সকল মুসলমানদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু করণীয় আমল রয়েছে।নিচে ধাপে ধাপে তা বর্নণা করা হয়েছে ঃ-

মিসওয়াক এবং গোসল করা ঃ মিসওয়াক এবং গোসল করা স্বাভাবিক ভাবেই সুন্নাত। কিন্তু ঈদের দিনে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে গোসল করতেন

উত্তম পোষাক পরিধান ঃ ঈদের দিন সব থেকে উত্তম পোষাক টি পরিধান করার সুন্নত। হাদীস শরীফের মধ্যে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম প্রত্যেক ঈদে উত্তম পোশাক পরিধান করতেন

নামাজের আগে কোন কিছু না খাওয়া ঃ এখানে ঈদুল ফিতরের দিন নামাজে যাওয়ার পূর্বে কোন মিষ্টান্ন জিনিস খেয়ে যাওয়া মুস্তাহাব। কিন্তু ঈদুল আযহার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। কুরবানী ঈদের দিন কোন কিছু না খেয়ে বরং কুরবানির গোশত প্রথম খাবার হিসেবে গ্রহণ করা মুস্তাহাব।

পথ পরিবর্তন ঃ অর্থাৎ ঈদগাহে নামাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং ফেরার পথে অন্য রাস্তা দিয়ে ঘরে ফেরা মুস্তাহাব। এই বিষয়ে হাদীস শরীফের মধ্যে এসেছে হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম ঈদ্গাহ্‌ থেকে ফেরার পথে রাস্তা পরিবর্তন করতেন।

হেটে ঈদ্গাহে যাওয়া এবং আসা ঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ঈদেই পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন। তাহার সামনে একটি বর্ষা বহন করিয়া নেওয়া হইতো অতঃপর নামাজের সময় তাহার সামনে ' সুতরা' হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হইত (বায়হাকি)

অন্যান্য বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন এবং পায়ে হেঁটে ঈদগাহ থেকে প্রস্থান করতেন।

তাকবীর বলতে বলতে ঈদগাহের দিকে যাওয়া ঃ ঈদগাহে যাওয়ার পথে জোরে জোরে তাকবির বলতে বলতে যাওয়া সুন্নত। হাদিস শরীফের মধ্যে এসেছে হযরত নাফে (রাঃ) হতে বর্ণিত হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু দুই ঈদের নামাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হতেন। এবং ঈদগাহে পৌঁছানোর পরেও ইমাম নামাজ আরম্ভ করার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত তাকবীর বলতেন।

অন্য বর্নণায় এসেছে হজরত আবু আব্দুর রহমান সুলামি (রাঃ) হতে বর্ণিত সাহাবায়ে কেরাম ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজাহায় বেশি তাকবির পাঠ করতেন।

তাকবীর ঃ আল্লাহু আক্‌বার আল্লাহু আক্‌বার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আক্‌বার আল্লাহু আক্‌বার ওয়া লিল্লাহিল হামদ্‌। অর্থ ঃ- আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন ইলাহ্‌ নেই, আল্লাহ মহান,আল্লাহ মহান, সব প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য।

শিশুদের ঈদ্গাহে নিয়ে যাওয়া ঃ ঈদের দিন ছোটদেরকে ঈদগাহের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া মুস্তাহাব আমল। হাদীস শরীফের ভিতরে এসেছে ঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় ঈদেই যখন ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হতেন তখন হাসান, হোসাইন, ওসামা ইবনে জায়েদ , ফজল ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লা্‌হ, আব্বাস , আলী , জাফর , হাসান , যায়েদ ইবনে হারেসা এবং উম্মে আইমানের ছেলে আইমান ইনাদেরকে সঙ্গে নিয়ে উচ্চ আওয়াজে তাকদীর পাঠ করতে করতে কামারদের রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং ফেরার পথে মুচিদের রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতেন (ইবনে খুজাইমা)

ঈদের নামাজ ঈদগাহে আদায় করা ঃ ঈদের নামাজ ঈদগাহে আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। হাদীস শরীফের মধ্যে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় ঈদের দিন ঈদগাহে যেতেন (বুখারী) হ্যাঁ তবে যদি বৃষ্টিপাত হয় তাহলে ঈদের নামাজ মসজিদে আদায় করা যাবে এতে কোন গুনাহ হবে না।

হাদিস শরীফের মধ্যে এসেছে হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত একদা ঈদের দিন বৃষ্টি হচ্ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের কে নিয়ে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করলেন (আবু দাউদ)

কোরবানির হুকুম ঃ হযরত উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যখন তোমরা জিলহজের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা পোষণ করবে তখন সে যেন তার চুল নখ ইত্যাদি না কাটে (মুসলিম)

কুরআনুল কারীমের মধ্যে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন ''আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি সুতরাং আপনি আপনার রবের জন্য নামাজ পড়ুন এবং কুরবানী করুন'' (সূরা কাওসার; আয়াত ১-২)

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ''সমর্থ্য থাকার পরও যে ব্যাক্তি কোরবানি করলো না সে যেন  ঈদগাহের ধারে কাছে না আসে''

কুরবানী করার সময় ঃ কুরবানী করার নিয়ম হচ্ছে ঈদুল আযহার নামাজের পর। অর্থাৎ ঈদের নামাজের আগে কখনো কুরবানী করা জায়েজ নয়। যদি কেউ ঈদের নামাজের আগে কোরবানির পশু জবেহ করে ফেলে তাহলে সেটি কুরবানী করা হবে না শুধু জবেহ করা হবে।

কুরবানির নেসাব ঃ যার কাছে যাকাতের নেসাব পরিমাণ মাল রয়েছে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব। অর্থাৎ কারো কাছে সাড়ে সাত ভরি সোনা অথবা সারে বাহান্ন ভরি রুপা অথবা সেই পরিমাণ নগদ টাকা থাকলে অথবা বাণিজ্যিক পণ্য অথবা প্রয়োজন এর চেয়ে অতিরিক্ত জিনিসপত্র থাকলে তার উপর কোরবানি ওয়াজিব।

তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে যাকাতের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে। শর্তগুলো হচ্ছে উল্লেখিত সম্পদ মালামাল গুলো বর্ধনশীল হওয়া। এবং উল্লিখিত সম্পদ গুলো নিজের কাছে এক বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হওয়া।

কুরবানী কবুল হওয়ার শর্ত ঃ কুরবানী বিশুদ্ধভাবে আদায় হওয়ার ছয়টি শর্ত রয়েছে। আমরা টাকা দিয়ে পশু কিনে যবেহ করি আল্লাহকে খুশি করার জন্য। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার জন্য। কিন্তু আমরা যদি না জানি যে কিভাবে কুরবানী করলে কুরবানী কবুল হবে তাহলে আমাদের শুধু পশু জবেহ করা হবে কুরবানী আদায় হবে না। তাই কুরবানী কবুল হওয়ার শর্তগুলো অবশ্যই জেনে রাখা উচিত।

শর্ত এক ঃ নিয়ত বিশুদ্ধ হতে হবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে রাজি খুশি করার উদ্দেশ্যে কুরবানী করতে হবে। কেউ লোক দেখানো উদ্দেশ্য নিয়ে কুরবানী করলে অথবা প্রতিযোগিতা স্বরুপ  কোরবানি করলে অথবা গোস্ত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কুরবানী করলে কুরবানী কবুল হবে না।

শর্ত দুই ঃ আমরা অনেক সময় একের অধিক মিলে শরিক হয়ে কোরবানি দিয়ে থাকি। অর্থাৎ ভাগে কুরবানী দিয়ে থাকি। এই ভাগে কুরবানী দেওয়ার সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য নিয়ত রাখে এমন কোন ব্যক্তি কে শরিক করে কুরবানী করা যাবে না। কারণ সেই একটি ব্যক্তির জন্য পুরো কোরবানি বাতিল হয়ে যাবে। একজনের নিয়তের খুত থাকলে কুরবানী নষ্ট হয়ে যাবে।

শর্ত তিন ঃ পশুর জবাই করার সময় খালেস দিলে শুধুমাত্র আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য, এবং মহান আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করার লক্ষ্যে কোরবানির নিয়ত করতে হবে।

শর্ত চার ঃ কোরবানিদাতা ছাড়া অন্য কেউ পশু জবাই করলে কোরবানি দাতার অনুমতি থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট মৌখিক অনুমতি না পেলেও কমপক্ষে ইঙ্গিত বাহি অনুমতি থাকতে হবে। কারণ যিনি কুরবানী করবেন তার আদেশ ব্যতীত অন্য কেউ এসে তার পশু জবেহ করতে পারবে না।

শর্ত পাচ ঃ কোরবানির পশুর ক্ষেত্রে শরীয়তে গ্রহণযোগ্য ও ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ শরীয়তের বিধান অনুযায়ী ত্রুটিযুক্ত পশু কোরবানি করলে কোরবানি সহিহ হবে না

শর্ত ছয় ঃ কুরবানী দাতা জবাই করার সময় নির্দিষ্ট পশুর মালিক হতে হবে। অন্যের পশু কোরবানি করার নিয়তে জবাই করে এমন কেউ যদি নিজের খুব কাছের মানুষ হয় তবুও কুরবানি সহিহ হবে না।

কোরবানির পশুর বয়স ঃ হাদীস শরীফের মধ্যে এসেছে হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন '' কুরবানীতে তোমরা শুধু পরিপূর্ণ বয়সেই পশু জবাই কর, যদি পূর্ণ বয়সের পশু জোগাড় করতে কষ্ট হয় তাহলে ছয় মাস বয়সের দুম্বা জবাই কর'' (আবু দাউদ)

হাদিস শরীফের মধ্যে 'মুসিন্নাহ' পশুর জবাই করার কথা বলা হয়েছে। মুসিন্নাহ অর্থাৎ যে পশুর দাঁত উঠেছে। কিন্তু এখানে ফোকাহে কেরাম কুরবানী পশুর নির্ণয় করার ক্ষেত্রে বয়সের সীমা বর্ণনা করেছেন।

উটের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর এবং গরু বা মহিষের ক্ষেত্রে দুই বছর। ছাগল ভেড়া অথবা দুম্বার ক্ষেত্রে এক বছর হলেই কুরবানী দেওয়া যাবে।

কুরবানি ঈদের আমল সম্পর্কে শেষ কথা 

কোরবানি ঈদ হচ্ছে অনেক ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীনের কাছে এই দিনটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই দিনে তিনি তার খলিল হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর সব থেকে কঠিন পরীক্ষা নিয়েছিলেন। এবং এই পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এই ঘটনা থেকে মহান আল্লাহকে খুশি করার জন্য তার নৈকট্য অর্জন করার জন্য কুরবানী করার প্রথা চালু হয়। কুরবানী করার অনেক ফজিলত রয়েছে।

সামর্থ থাকলে প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্যই তার রব কে রাজি খুশি করার জন্য কুরবানী করা উচিত।কোরবানি হচ্ছে একটি পরীক্ষা। রবের জন্য ত্যাগের পরীক্ষা। কুরবানীর রক্ত মাংস কোন কিছুই আল্লাহতালার কাছে পৌঁছায় না। আল্লাহ তাআলার কাছে পৌঁছায় আমাদের বিশুদ্ধ তাকওয়া। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে কুরবানী করার তৌফিক দান করুন। আমীন

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

পোষ্ট পড়ে আমাদেরকে আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন। আপনাদের প্রতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়

comment url